টেরোরিস্ট কাকে বলবেন আর কাকে নয়

পৃথিবীর ইতিহাসে ইহুদিদের টেরোরিস্ট অর্গানাইজেশন যিলট সিকারিদের পর আসে শিয়া মুসলিম ইসমাইলি টেরোরিস্টঃ এসাসিনস। ইরান, সিরিয়া ও ইস্টার্ন টার্কিতে পরিচালিত এই সংগঠন কিডন্যাপিঙের মাধ্যমে রিক্রুট করতো, তারপর তাদের হাশিস নামক ড্রাগস খাইয়ে অফুরন্ত আনন্দ, ফূর্তি দেখিয়ে বলতো, u r dead & in heaven now.

টেরোরিস্ট কাকে বলবেন আর কাকে নয়

তারপর আবার দুনিয়াবি ব্যাপার স্যাপার দেখিয়ে বলতো, হেভেনে ফিরে যেতে হলে তোমাকে কিছু কাজ করতে হবে, কাজটা টেরোরিজম।

সেলজুক টার্কিশ এম্পায়ার পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছিলো এসাসিনরা, ওরাও ধ্বংস হয়েছিল মঙ্গোলিয়ান চেঙিস খানের হাতে। ফলাফল হিসেবে সৃষ্টি হয় পলিটিকাল ভ্যাকুয়াম, জন্ম নেয় গ্লোরিয়াস অটোমান সাম্রাজ্য, সুলতান সুলেমান হুররম, যা শেষ হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মাধ্যমে।

এর পরেও অনেক মুসলিম টেরোরিস্ট অর্গানাইজেশনের জন্ম হয়েছে, কিন্তু শ্রীলঙ্কার মিশ্র ধর্মের জাতীয়তাবাদী তামিল টাইগারদের মতো শক্তিশালী কেউ হতে পারে নি, ওদের নিজস্ব এয়ারফোর্স ছিল।

ব্রিটিশ আমলে শ্রীলঙ্কা ছিল ক্রাউন স্টেট, ইন্ডিয়া থেকে রুলিং হতো না, সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতো ব্রিটেন।

শ্রীলঙ্কার মেজরিটি সিংহলিরা বৌদ্ধ ও ক্রিশ্চান। কিন্তু ১৮০০ সালের দিকে ব্রিটিশ আগমনে উত্তর ও উত্তর পূর্বাঞ্চলের তামিলরা ইংলিশ শিখে নেয়। ফলে জনসংখ্যার হিসেবে তামিলরা ২০% হলেও প্রায় ৭০% সিভিল সার্ভিস তারা দখল করে নেয়।

শ্রীলঙ্কায় আগে থেকেই কিছু তামিল ছিল। তবে চা বাগানে কাজের জন্য ইন্ডিয়ার তামিলনাড়ু থেকেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তামিল লেবার শ্রীলঙ্কায় আসে। শ্রীলঙ্কার মুসলিমরা প্রধানত তামিল। ওরা ডাচ এবং পর্তুগিজ নিয়ন্ত্রণেও ছিল। বলা হয় বেঙ্গলের রাজপুত্র ছিলেন শ্রীলঙ্কার ফোর-ফাদার।

১৯৪৮ সালে শ্রীলঙ্কা স্বাধীন হয় কিন্তু সিভিল সার্ভিসে তখন সিংহলিরা কেউ নেই বললেই চলে।

তখন সিংহলি প্রেসিডেন্ট বেশ কিছু কৌশলগত জাতীয়তাবাদী পলিসি নেন। সিংহলিকে করেন রাষ্ট্রভাষা, আনেন রাষ্ট্রধর্ম, পতাকায় আনেন বৌদ্ধ সিম্বল, চা বাগানের লেবাররা নাগরিক নন এবং ভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষায় তামিলদের বেশি নাম্বার পেতে হবে মর্মে জারি করেন পরিপত্র।

১৯৭৭ সালে শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ এন্টি-তামিল রায়ট হয়, হয় গণহত্যা। তামিলদের মধ্যে তৈরি হয় বিভিন্ন সাবগ্রুপ। মারামারি করে লিড নেয় প্রভাকর, খৃষ্ট ধর্মাবলম্বী, তৈরি করে LTTE: Liberation Tigers of Tamil Eelam. ওরা বিভিন্নভাবে গ্লোবালি ফান্ড কালেক্ট করতো, অন্যতম ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি। শ্রীলঙ্কার উত্তর এবং উত্তর পূর্বাঞ্চলের কোস্টাল এরিয়ায় ছিল ওদের বসবাস।

ভয়ানক শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল তামিল টাইগাররা। নিজেদের প্রগ্রেসিভ দেখাতে রিক্রুট করেছিল মহিলা টেরোরিস্ট, আত্মঘাতি বম্বিংকে আর্টের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল। ইন্ডিয়ান র ওদের সহায়তা করা শুরু করলো।

কিন্তু বিধি বাম। ১৯৯১ সালে উল্টা রাজীব গান্ধীকে হত্যা করলো LTTE- র মহিলা টেররিস্ট ধানু। ঠিক যেভাবে আমেরিকা লাদেনকে সৃষ্টির পর এক পর্যায়ে লাদেনই ওদের বিপরীতে চলে গিয়েছিল, ঠিক সেভাবেই। এরপর ইন্ডিয়া ওদের সাপোর্ট দেয়া বন্ধ করে দেয়।

তামিলরা দ্বিতীয় ধাক্কা খায় ২০০৫ সালের সুনামিতে, ওদের কোস্টাল বেইজ পুরো লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়।

সর্বশেষ ধাক্কাটা আসে ইন্টারনালি। LTTE- র ইন্টেলিজেন্স প্রধান কর্নেল করুনা সিংহলি প্রেসিডেন্ট রাজাপক্ষের দলে যোগ দেয়ায় সিংহলিদের কাছে তামিলদের সব ইনফো চলে যায়। শ্রীলঙ্কায় একদা আর্মি ছিল না। ওদের বেশ কিছু কন্টিনজেন্ট আমাদের দেশের ভাটিয়ারিতে ট্রেনিং নিয়েছিল।

অবশেষে টারমিনেটর হিসেবে নেমে আসেন শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট। ২০১০ সালের দিকে ধ্বংস হয় তামিল জাতীয়তাবাদ, LTTE। তবে এতটা এগ্রেসিভনেসের কারণে যুদ্ধাপরাধের মামলা খান সিংহলি সেনাপ্রধান।

এই LTTE তামিল টাইগাররা কিন্তু তামিল জনগোষ্ঠীর কাছে ছিল ফ্রিডম ফাইটার, বিপরীতে সিংহলিদের কাছে টেরোরিস্ট।

তাই কাকে টেরোরিস্ট বলবেন আর কাকে নয়, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে সঙ্গাটা কে দিচ্ছেন তার পলিটিকাল আইডিওলজি এবং আন্ডারস্ট্যান্ডিং অব দা ফ্যাক্টের উপর।

পুরাটাই পলিটিকাল খেলা। এই কারণে গ্লোবালি প্রতি বছর টেরোরিজমের কারণে মৃত্যুর চেয়ে পানিতে ডুবে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি হলেও টেরোরিজমটাকে বুঝা অধিক জরুরি।

Leave a Reply